প্ল্যানচেট

0
189

ধাতকাঠি বেস ক্যামপে সন্ধ্যার পরে আর কিছু করার ছিল না। চার-পাঁচ দিনের কাজ নিয়ে এসেছি। জিওলজিক্যাল সারভে অব ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে সিংভূম কপার বেলটে তামার খনি অনুসন্ধানের কাজ কীরকম চলছে সে সম্পর্কে খোঁজখবর করে খবরের কাগজে গোটা কয়েক প্রবন্ধ লিখতে হবে। জায়গাটা টাটা-নগর রেল স্টেশন থেকে মাইল পাঁচেক দূরে। পাহাড় আর শাল-মহুয়ার জঙ্গলে ঢাকা। আশেপাশে লোকালয়ের চিহ্ন নেই। কয়েক একর জায়গা নিয়ে মিলিটারি ব্যারাকের মত কতগুলি কোয়ার্টার্স। মাটির দেওয়াল, খড়ের ছাউনি। দুজন জিওলজিস্ট ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। এছাড়া থাকেন নানা শ্রেণীর আরও কয়েকজন কর্মচারী। কলকাতা থেকে মোবাইল ফিলড ল্যাবরেটরির লোক-জনেরা এলে তাঁদেরও থাকার ব্যবস্থা আছে।

সকালবেলা উঠে সিনিয়র জিওলজিস্ট তুষার রায়ের সঙ্গে জীপে করে বেরিয়ে যেতাম। কোনদিন খারসোয়ান হয়ে, সেরাই-কেলা। কোনদিন বা রাখা-রোম হয়ে সুরদা, মুশাবনি, পাথর-গোড়া। সঙ্গে থাকতেন ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়র সুকুমার সামন্ত। আমাকে ওঁরা দেখাতেন, মাঠের মধ্যে কিংবা জঙ্গলের ভিতর অস্থায়ী তাঁবু খাটিয়ে ড্রিলিং ইউনিট কীভাবে কাজ করছে। মাটিতে বোর হোল করে রিগ মেশিন দিয়ে মাটির ভেতরকার তামার নমুনা কেটে কেটে ওপরে তোলা হচ্ছে।

তুষারবাবু আর সুকুমারবাবু দুজনেই খুব জমাটি লোক। বয়সেও তরুণ। আমাকে নানান মজার মজার কথা বলে মাতিয়ে রাখতেন। সুকুমারবাবু বলতেন, ‘‘কী করব মশায় ,আপনাদের মত অমন কলম নেই। থাকলে কত রোমাঞ্চকর কাহিনী লিখতে পারতাম। এতদিনে দশ-বারোখানা বই হয়ে যেত।’’
আমি বললাম, ‘‘আচ্ছা সুকুমারবাবু, আপনার তো এত অভিজ্ঞতা, বনে-জঙ্গলে ঘোরেন, কোনদিন ভূত দেখেছেন?’’
সুকুমারবাবু এ প্রশ্নের জন্য ঠিক তৈরি ছিলেন না। বললেন, ‘‘ভূত? না মশায়, ভূত সম্পর্কে কোনদিন কিছু ভাবিনি। আমার নিজের কোন অভিজ্ঞতা নেই। তবে তুষারবাবু হয়ত এ বিষয়ে আপনাকে কিছু আলোকপাত করতে পারবেন। কারণ তুষারবাবু একটু আধটু প্রেতচর্চা করে থাকেন। ’’
এসব কথা হচ্ছিল আমার ধাতকাঠি আসার দ্বিতীয় দিন। সেদিন আমরা জীপে করে ঘাটশিলার দিকে চলেছি। মৌভান্ডার কপার প্ল্যানট দেখে যদুগোড়া ইউরেনিয়াম প্ল্যানটের ম্যানেজারের সঙ্গে বিকেলে চা খাব এই প্রোগ্রাম। এদিন আমাদের আর একজন নতুন সঙ্গী মোবাইল ল্যাবরেটরির কেমিস্ট ডঃ জগদীশ শিকদার।
সুকুমারবাবুর কথা শুনে আমি রোমাঞ্চের গন্ধ পেয়ে লাফিয়ে উঠলাম। তুষার রায় আমার বাঁ পাশে বসে। আমি বললাম, ‘‘কী তুষারবাবু আপনি প্রেতচর্চা করেন নাকি?’’
তুষারবাবু বললেন, ‘‘সুকুমারের কথা ছেড়ে দিন।’’
সুকুমারবাবু বললেন, ‘‘কেন ছেড়ে দেব কেন? চ্যাটার্জী সাহেবকে তোমার সেসব অভিজ্ঞতার কথা বল না তুষার। উনি গল্পের ভাল প্লট পাবেন।’’
আমি বললাম, ‘‘হ্যাঁ বলুন না!’’
তুষারবাবু বললেন, ‘‘না তেমন কিছু বলার মত নয়। জিও-লজিস্টের কাজ জানেন তো, বছরের অধিকাংশ সময় জঙ্গলে-জঙ্গলে কাটে। সন্ধ্যার পর কিছু করার থাকে না। এক সময়, সময় কাটাবার জন্য প্ল্যানচেট করতাম।’’
কেমিস্ট ডঃ শিকদার পিছনের সিটে বসে ছিলেন। বলে উঠলেন, ‘‘প্ল্যানচেট? আপনি বৈজ্ঞানিক হয়ে এইসব আজগুবি ব্যাপারে বিশ্বাস করেন?’’

তুষারবাবু বললেন, ‘‘হ্যাঁ করি। কারণ আমি নিজে প্ল্যানচেটে অনেক আত্মাকে এনেছি। ছোটবেলা থেকে প্ল্যানচেট করা দেখে আসছি। আমার ঠাকুমা নিয়মিত প্ল্যানচেট করতেন। ওঁর কাছেই প্রথম প্ল্যানচেট করা শিখি। আর আমি কেন, প্ল্যানচেট সম্পর্কে অনেক বড় বড় লোক অনেক কথা লিখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় নিজে নিয়মিত প্ল্যানচেট করেছেন।’’
আমি সুযোগ পেয়ে বলে উঠলাম, ‘‘দেখুন ধাতকাঠিতে আমারও সন্ধ্যার পর কিছু করার থাকছে না। আপনাদের ইলেকট্রিসিটিরও ভোলটেজ এত কম, যে পড়াশোনাও করতে পারি না। আজ রাত থেকেই প্ল্যানচেটের আসর বসান না।’’
সুকুমার সামন্ত বললেন, ‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি আর আপত্তি কোরো না তুষার। চ্যাটার্জী সাহেব এসেছেন, ওঁকে দেখিয়ে দাও।’’

তুষারবাবু বললেন, ‘‘আগেই বলেছি আমার ঠাকুমার কাছ থেকে প্ল্যানচেট করতে শিখি প্রথম। ঠাকুমা তখনকার দিনের বেথুন কলেজের গ্র্যাজুয়েট। ওঁর ছোট মেয়ে মানে আমার ছোট পিসি হঠাৎ মারা যাওয়ার পরে ঠাকুমা প্ল্যানচেটে মেয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। সেই ঠাকুমা মারা গেলেন তখন আমি ক্লাস এইট-এ পড়ি। আমি ও আমার সেজদা ঠাকুমাকে খুব ভালবাসতাম। মাঝে মাঝে ছাদে গিয়ে দুজনে প্ল্যানচেটে ঠাকুমাকে ডাকতাম। আমাদের সঙ্গে অনেক গল্প করতেন ঠাকুমা। অধিকাংশই সাংসারিক কথাবার্তা, বাড়ির সবাই কে কেমন আছে খোঁজ নিতেন। আমি ও সেজদা পরীক্ষা দিয়ে জিজ্ঞাসা করতাম, ‘আমরা পাশ করতে পারব তো ঠাকুমা?’ ঠাকুমা বলতেন ‘পাশ হবে। তবে বড্ড ফাঁকি দিচ্ছিস পড়াশোনায়।’ সেই সময় আমার প্রাণের বন্ধু ছিল বিমান বলে আমাদের ক্লাসের একটি ছেলে। কিন্তু কী একটা ব্যাপার নিয়ে আমাদের দুজনের মধ্যে খুব মন কষাকষি হয়ে গেল। আমাদের মধ্যে কথা বন্ধ। মন খুব খারাপ এজন্য। রাতে ঠাকুমাকে এ কথাটা জিজ্ঞাসা করব ভাবলাম। কথাটা হল, ‘ঠাকুমা, বিমান কি আমায় ভালবাসে?’ কিন্তু কিছুতেই কথাটা জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। হঠাৎ দেখি আমার কলমে সর সর করে লেখা ফুটে উঠেছে। ‘তারা (আমার ডাকনাম) তোকে ও সত্যি ভালবাসে।’ আমার হাত থেকে পেনসিল পড়ে গেল। গা শির শির করে উঠল। সেজদা জিজ্ঞাসা করল, ‘এই তারা কী হল তোর? কী জিজ্ঞাসা করেছিলি ঠাকুমাকে?’ আমি কোন জবাব দিতে পারলাম না।’’
শেষ পর্যন্ত অনেক পীড়াপীড়িতে তুষারবাবু প্ল্যানচেটের আসর বসাতে রাজি হলেন।
অতএব সন্ধ্যার কিছু পরে আমার ঘরে এসে হাজির হলেন সবাই– তুষারবাবু, সামন্ত আর ডঃ শিকদার। ইলেক্ট্রিক আলো নিবিয়ে দেওয়া হল। শুধু একটি হ্যারিকেন জ্বালা রইল। আমার পড়ার টেবিলটা ঘরের মাঝখানে রেখে তার চারপাশে চারজন।
তুষারবাবু বললেন, ‘‘আমার পদ্ধতিটা একটু ভিন্ন রকমের। ঠাকুমা আমায় বলতেন যাকে তাকে প্ল্যানচেটের মিডিয়ম করা চলবে না। কতগুলো লক্ষণ দেখে, মিডিয়ম নির্বাচন করতে হয়। সে লক্ষণগুলো আমি এখানে বলতে চাই না। তবে চ্যাটার্জী সাহেবকে দেখে মনে হচ্ছে উনি একজন আদর্শ মিডিয়ম। আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি পেনসিলটা আলতো করে কাগজের ওপর ধরে মনে-মনে কোন আত্মার কথা চিন্তা করুন।’’
আমি বললাম, ‘‘না মশায়, ওসব আমি পারব না। আপনি নিজে মিডিয়ম হন। আমরা বরং দেখি।’’
তুষারবাবু বললেন, ‘‘ভয় পাচ্ছেন?’’
আমি বললাম, ‘‘একটু একটু।’’
‘‘তাহলে আপনাকে দিয়ে হবে না। মিডিয়ম ভয় পেলে আত্মারা আসতে চাইবেন না। তাহলে আমিই মিডিয়ম হচ্ছি। শুনুন আপনারা কোন কথা বলবেন না। আর পরস্পর পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকবেন।’’
তাই হল। একটু একটু করে আলো নিস্তেজ হয়ে এল। সাদা দেওয়ালে আমাদের ছায়াগুলো পড়ল। পাছে বাইরের আলোর ছটা এসে ঢোকে এজন্য জানালাগুলোও বন্ধ করা রয়েছে। কোথাও জীবনের কোন স্পন্দন আছে বলে মনে হল না। শুধু বাইরে থেকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার অশ্রান্ত আওয়াজ কানে এসে বিধঁতে লাগল।
তুষারবাবুর হাতে একটি কৌটোর ঢাকনি ত্রিভুজের মত করে কাটা। মাঝখানে ফুটো করে একটি পেনসিল বসানো। সেটা আলতো করে ধরা।
একটু পরে দেখলাম, ঢাকনিটা নড়ে উঠল। তুষারবাবুর মুখ শক্ত হয়ে উঠেছে। চোখের দৃষ্টি পাথরের মত।
ওঁর পেনসিল নড়ে উঠল।
তুষারবাবু অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কে?’’
খস-খস করে লেখা ফুটে উঠল, ‘‘আমি ঠাকুমা।’’
‘‘কেমন আছ?’’
‘‘ভাল। তুই এতদিন আমায় কী করে ভুলে আছিস তারা?’’
‘‘আর তোমাদের কষ্ট দিতে ভাল লাগে না ঠাকুমা।’’
‘‘কষ্ট কী বলছিস তারা? তুই ডাকবি বলে কতদিন ঘোরাঘুরি করেছি তা জানিস?’’
‘‘তুমি আমায় এখনও খুব ভালবাস ঠাকুমা, তাই না?’’
‘‘ও মা, বাসব না? তুই তো ছিলি আমার সবচেয়ে নেওটা। হ্যাঁরে, তোর সেজদা কী করছে?’’
‘‘দুর্গাপুরে আছে ঠাকুমা। সেজদার গত মাসে একটি মেয়ে হয়েছে।’’
‘‘আহা বেঁচে বর্তে থাক সব। তোর বড় মন খারাপ, তাই না রে? ও নিয়ে মিছিমিছি মন খারাপ করিস না, ওটা হবে না, তোর ভাগ্যে নেই।’’
আমি দেখলাম শেষের কথাগুলো তুষারবাবু কিছুতেই ভাল করে লিখতে পারছেন না। যেন কোন অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে, সংগ্রাম করছেন। লেখা যেই শেষ হল অমনি তাঁর হাত থেকে পেনসিলটা পড়ে গেল। তিনি মাথা নিচু করে বসে পড়লেন।
‘‘কী হল? কী হল? ও তুষারবাবু?’’
তুষারবাবু বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘‘আশ্চর্য, এবারও ঠাকুমা সব জেনে ফেলেছেন।’’
‘‘কী জেনে ফেলেছেন? ’’ সামন্ত প্রশ্ন করল।
‘‘আমার একটা অত্যন্ত ব্যক্তিগত সমস্যার কথা। গত পাঁচ-ছ মাস ধরে যার জন্য উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। লুকিয়ে লুকিয়ে একটা চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিলাম। খুব আশা ছিল চাকরিটা পাব…. কিন্তু…’’

পরের দিন আবার দিনের বেলাটা কাটল জঙ্গলে-জঙ্গলে। ডঃ শিকদার এদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন না। ল্যাবরেটরি টেস্টের জন্য ব্যস্ত ছিলেন। সকালবেলা তাঁর সঙ্গে দেখা হল। আমি বললাম, ‘‘প্ল্যানচেট বিশ্বাস করেন না তো, দেখলেন, কাল কী আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল।’’
ডঃ শিকদার বললেন, ‘‘আপনিও যেমন, ওই সবে আপনি এখনও বিশ্বাস করেন?’’
আমি একটু রেগে বললাম, ‘‘তাহলে কাল রাতে যা দেখলাম, আপনি বলতে চান সব বুজরুকি?’’
‘‘না, বুজরুকি নাও হতে পারে। তবে হ্যালুসিনেশন। মানুষ যা শুনতে ইচ্ছা করে অবচেতন মনের কাছ থেকে সেই জবাবই পাচ্ছে। আর সেটাই লেখা হয়ে যাচ্ছে। মানুষের মৃত্যুর পর তার কোন অশরীরী অস্তিত্ব থাকতে পারে না।’’
আমি ক্ষীণ কণ্ঠে বলার চেষ্টা করলাম, ‘‘অশরীরী অস্তিত্বের নানান ঘটনার কিন্তু আমি সাক্ষ্য পেয়েছি।’’
ডঃ শিকদার বললেন, ‘‘আপনি পেতে পারেন। আপনি গাল-গল্প লেখেন, অলৌকিকে বিশ্বাস না করলে আপনাদের চলে না। আমি বৈজ্ঞানিক লোক, বিজ্ঞান ও যুক্তিতর্ক ছাড়া কিছু মানতে চাই না। আচ্ছা আমায় উনি মিডিয়ম হতে তো বললেন না। দেখতাম আমার হাত দিয়ে ওসব লেখা আসত কি না। ’’
আমি বললাম, ‘‘বেশ তো, আপনি আজ মিডিয়ম হন না।’’
ডঃ শিকদার বললেন, ‘‘আমাকে হতে দিলে তো। দেখলেন না, তুষারবাবু আমার কথা তুললেনই না।’’
পরদিন রাতে আবার প্ল্যানচেটের আসর বসল।
আমি বললাম, ‘‘তুষারবাবু, ডঃ শিকদার আজ মিডিয়ম হতে চান। আপনার আপত্তি আছে?’’
তুষারবাবু একবার ডঃ শিকদারের আপাদমস্তক দেখে নিলেন। তারপর বললেন, ‘‘মনে হচ্ছে মিডিয়মের পক্ষে উনি উপযুক্ত নন।’’
ডঃ শিকদারের মুখের কোণে উপহাসের হাসি দেখা গেল। তিনি বললেন, ‘‘আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলাম। উনি আমাকে মিডিয়ম করতে রাজি হবেন না।’’
তুষারবাবু বললেন, ‘‘ডঃ শিকদার, আপনাকে মিডিয়ম হতে দিলে আপনারই ক্ষতি হবার সম্ভাবনা। মিডিয়মের নিরাপত্তার জন্য কতগুলি লক্ষণ আমাদের মিলিয়ে দেখতে হয়।’’
‘‘আরে রাখুন ওই সব লক্ষণ। আমায় করতে চান না তাই বলুন।’’
‘‘বেশ আপনাকে করতে পারি, কিন্তু কোন কিছু হলে আমাকে দায়ী করবেন না।’’
‘‘কোন কিছু মানে?’’
‘‘এই ধরুন কোন বিপদ-টিপদ।’’
ডঃ শিকদার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
হ্যাঁ, ডঃ শিকদারকেই মিডিয়ম করা হল। তিনি প্ল্যানচেটের চাকতিশুদ্ধ পেনসিলটা হাতে করে বসে রইলেন। তুষারবাবু ওঁর চোখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন বিড় বিড় করে বললেন। তারপর বললেন, ‘‘ ডঃ শিকদার, আপনার খুশিমত কোন আত্মার কথা চিন্তা করুন। অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করুন।’’
ডঃ শিকদার চোখ বুজলেন। আবার কিছুক্ষণ পরে চোখ খুললেন। বেশ দেখতে পেলাম তার মুখের ছবি পালটে যাচ্ছে। তিনি ক্রমশ ধ্যানগম্ভীর এক মাটির স্ট্যাচুতে পরিণত হলেন। তারপর তাঁর সর্বশরীর নড়ে উঠল। তিনি বলে উঠলেন, ‘‘কে, কে?’’
‘‘আমি তোমার মা।’’ কাগজে লেখা ফুটে উঠতে লাগল। ডঃ শিকদারের পেনসিল চলছে খসখস করে।
‘‘তুমি কোথা থেকে এলে?’’
‘‘কলকাতা থেকে।’’
‘‘কলকাতার খবর কী?’’
‘‘সব ভাল। বউমা খুব কান্নাকাটি করছে দেখে এলাম।’’
‘‘কেন? কেন? ’’ অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করলেন ডঃ শিকদার।
পেনসিলটা কী যেন লিখতে গেল কিন্তু লিখতে পারল না। একটু নড়ে স্থির হয়ে গেল।
ডঃ শিকদার আবার ডাকলেন, ‘‘মা-মা।’’
আবার লেখা ফুটে উঠল, ‘‘আসতে খুব কষ্ট হয়েছে।’’
‘‘কষ্ট কেন?’’
‘‘হবে না? কম দূর পথ নাকি?’’
‘‘তুমি কী করে এলে?’’
‘‘যেভাবে সবাই আসে। তুই ডাকলি, না এসে থাকতে পারলাম না।’’
‘‘কিন্তু বউমা কাঁদছে কেন মা?’’
কোন উত্তর পাওয়া গেল না।

ডঃ শিকদার আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘মা, মা, বউমা কাঁদছে কেন?’’
হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এসে বাইরের জানালাটা খুলে দিয়ে গেল। দপ দপ করে নিবে গেল হ্যারিকেনটা। টেবিলটা প্রবল জোরে নড়ে উঠল। আমরা চমকে উঠলাম। শুনলাম অন্ধকারের মধ্যে ডঃ শিকদার চেঁচাচ্ছেন, ‘‘সব বোগাস, সব বোগাস। আমাকে সম্মোহিত করে আমার হাত দিয়ে মনোমত উত্তর লিখিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু এই প্ল্যানচেট যে কত বড় বোগাস তার বড় প্রমাণ আমার মা জীবিত। তিনি সুস্থ-সমর্থ। গত পরশু, আমি কলকাতা ছেড়েছি। পরশু পর্যন্ত জানি, তিনি সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন।’’
তুষারবাবু বললেন, ‘‘তাহলে আপনি জীবিত মানুষকে কেন স্মরণ করলেন ডঃ শিকদার?’’
ডঃ শিকদার বললেন, ‘‘আপনাদের এই প্ল্যানচেট যে কত বোগাস তা প্রমাণ করার জন্য!’’
‘‘কিন্তু আপনি জানেন না কী সর্বনাশ আপনি করেছেন! আপনাকে এই জন্যেই আমি মিডিয়ম করতে চাইনি। ইভল স্পিরিট আপনার ক্ষতি করতে পারে। পারে কি, করেছেও হয়তো ডঃ শিকদার।’’ তুষারবাবু গম্ভীর মুখে বললেন।
ডঃ শিকদার এবার যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। বললেন, ‘‘কী বলছেন আপনি?’’
তুষারবাবু বললেন, ‘‘যা বলছি, ঠিকই বলছি ডঃ শিকদার।’’
ঘন্টা দুয়েক পরে ঘটল ঘটনাটা। এবং যা ঘটল তা আমি কোনদিনই ভুলব না, ভুলতে পারব না। আজও সে রাতের সে পরিস্থিতির কথা মনে করলে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
রাত তখন দশটা। আমি খেয়েদেয়ে সবে শুতে যাব। দুঘন্টার আগেকার ঘটনাটা তখনও চোখের সামনে ভাসছে। ডঃ শিকদার প্ল্যানচেটের পর থেকে আরও অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। আমাকে অনেকবার বলেছেন, ‘‘কেমন দেখলেন তো ব্যাপারটা। জীবন্ত মানুষ চলে এল আপনাদের এই প্ল্যানচেটে।’’
কিন্তু তখনও ডঃ শিকদার জানতেন না নিয়তি তাঁর জন্য কী প্রস্তুত করে রেখেছে।
রাত দশটা নাগাদ একটা আর্তনাদ শুনে চমকে উঠলাম।
ডঃ শিকদার চিৎকার করছেন, ‘‘না, না এ হতে পারে না।’’
চিৎকার শুনে বেস ক্যামপের সব লোক ছুটে এসেছে তাঁর ঘরের সামনে। ভিড় জমে গেছে। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখি ডঃ শিকদার চিৎকার করছেন, ‘‘এ হতে পারে না, এ হতে পারে না।’’
তুষারবাবু ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে ডঃ শিকদারকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তুষারবাবুকে বাইরে ডেকে নিয়ে এলাম, কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করতে।

তুষারবাবু বললেন, ‘‘আমাদের এখানে ফোন নেই। কলকাতার সঙ্গে কোন জরুরি কথাবার্তা থাকলে দু মাইল দূরে আ্যাটমিক মিনারেলস ডিভিশনের অফিসে ফোন আসে। ওখান থেকে মেসেনজার দিয়ে খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ আগে ওখানে ডঃ শিকদারের বাড়ি থেকে এক জরুরি ট্রাঙ্ক কল এসেছে। ট্রাঙ্ক কল করেছিলেন মিসেস শিকদার। ঘন্টা দুয়েক আগে ডঃ শিকদারের মা তাঁর বাড়ির সামনে লরি চাপা পড়ে মারা গিয়েছেন। ওই সময় রাস্তায় যাবার কোনও প্রয়োজন ছিল না তাঁর। হঠাৎ কী খেয়াল হল, বললেন, ‘আমি একটু অরুণদের বাড়ি থেকে আসছি।’ অরুণ হল ওঁদের এক প্রতিবেশী। রাস্তায় যেই নেমেছেন অমনি লরি এসে…’’
তুষারবাবু বললেন, ‘‘টাইমটা ঠিক দুঘন্টা আগে, যখন ডঃ শিকদার প্ল্যানচেটে বসেছিলেন ঠিক তখনই। আমি তখনই মনে মনে আশঙ্কা করেছিলাম এমন একটা কিছু ঘটবে…. আমি তখনই আশঙ্কা করেছিলাম।’’ তুষারবাবু বিড়বিড় করে বললেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here